Sunday, 12 April 2026 | শনিবার, ২০২৬ জানুয়ারী ০৩, ০৯:৫৪ অপরাহ্ন

রক্তাক্ত চট্টগ্রাম: গ্যাং ওয়ার, টার্গেট কিলিং ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জ্বলছে চট্টগ্রাম

রক্তাক্ত চট্টগ্রাম: গ্যাং ওয়ার, টার্গেট কিলিং ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জ্বলছে চট্টগ্রাম                                                                                                                      

প্রতিবেদক
আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক উত্তাপের পাশাপাশি চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে শুরু হয়েছে রক্তের খেলা। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া অস্ত্রবাজি, আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধজগতের নতুন মেরুকরণে বন্দরনগরী চট্টগ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র আতঙ্ক।
বিশেষ করে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সে সময় লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার না হওয়ায় সন্ত্রাসীরা আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। চাঁদাবাজি, দখলবাজি থেকে শুরু করে ভাড়াটে খুনি হিসেবে কাজ করা—এই চক্রগুলোর দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতারাও এখন অনিরাপদ।

বায়েজিদ ‘কিলিং জোন’: সর্বশেষ শিকার বাবলা
চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, তার সর্বশেষ উদাহরণ বায়েজিদ-চালিতাতলী এলাকার ঘটনা। গত বুধবার (৫ নভেম্বর, ২০২৫) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী গণসংযোগে ঢুকে সন্ত্রাসীরা ফিল্মি কায়দায় গুলি চালায়। এই হামলায় এরশাদ উল্লাহ গুলিবিদ্ধ হন এবং ঘটনাস্থলেই নিহত হয় পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, বাবলাকে খুব কাছ থেকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার রেশ না কাটতেই পরদিন একই এলাকায় ইদ্রিস নামে এক অটোরিকশাচালককে গুলি করে সন্ত্রাসীরা, যা বায়েজিদ এলাকাকে একটি ‘কিলিং জোনে’ পরিণত করেছে।
বাবলার বাবা আব্দুর কাদের বায়েজিদ বোস্তামী থানায় যে হত্যা মামলা করেছেন, তাতে এই হত্যাকাণ্ডকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের ফসল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নেপথ্যের কারিগর: কারা নিয়ন্ত্রণ করছে চট্টগ্রামের অপরাধজগত?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রামের বর্তমান অপরাধজগত মূলত কয়েকটি শক্তিশালী গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে।
সাজ্জাদ সাম্রাজ্য (বিদেশ থেকে নিয়ন্ত্রণ): এই চক্রের মূল হোতা দুবাইয়ে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ। চট্টগ্রামের আলোচিত 'এইট মার্ডার' মামলার আসামি সাজ্জাদ বিদেশ থেকেই ফোনের মাধ্যমে তার বিশাল অপরাধ নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। তার নির্দেশেই নগরীর বায়েজিদ, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ এলাকায় চাঁদাবাজি, বালুমহাল দখল ও টার্গেট কিলিং সম্পন্ন হয়।
কারাগারে 'ছোট সাজ্জাদ': বড় সাজ্জাদের প্রধান সহযোগী ও ১৭ মামলার আসামি ছোট সাজ্জাদ গত মার্চে (২০২৫) ঢাকায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছে।

মাঠের নতুন 'কিলার': ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর সাজ্জাদ গ্রুপের মাঠ পর্যায়ের নেতৃত্ব চলে আসে রায়হান আলম ও মোবারক হোসেন ইমনের হাতে। পুলিশ ও বাবলার পরিবার সন্দেহ করছে, বাবলা হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয় রায়হান। সে বর্তমানে সাজ্জাদ গ্রুপের 'কিলিং স্কোয়াড' প্রধান হিসেবে পরিচিত।

দ্বন্দ্বের সূত্রপাত: নিহত বাবলা একসময় বড় সাজ্জাদেরই অনুসারী ছিল। কিন্তু পরে সে গ্রুপ থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব বলয় তৈরি করে। এই দলত্যাগ ও আধিপত্যের লড়াইয়ের জের ধরেই তাকে প্রতিপক্ষ গ্রুপের টার্গেটে পরিণত হতে হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 রাউজান: রাজনৈতিক খুনের অভয়ারণ্য
শুধু নগরীর বায়েজিদ নয়, চট্টগ্রামের অপরাধ মানচিত্রের আরেক আতঙ্কের নাম রাউজান। গত ১৪ মাসে (আগস্ট ২০২৪ থেকে) এই উপজেলায় ১৭টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যার মধ্যে ১২টিই সরাসরি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলে পুলিশ সূত্র নিশ্চিত করেছে।
আগামী নির্বাচন ঘিরে এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরমে পৌঁছেছে। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে একে অপরকে ঘায়েল করতে সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করা হচ্ছে। বাবলা হত্যাকাণ্ডের রাতেই (৫ নভেম্বর) রাউজানের বাগোয়ানে বিএনপির দুই পক্ষের গোলাগুলিতে পাঁচজন নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, আন্ডারওয়ার্ল্ডের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংঘাতও আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কতটা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
রাউজানের পাশাপাশি রাঙ্গুনিয়াতেও একই কারণে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কা করছে স্থানীয় মহল।
 ফোনে হুমকি, প্রকাশ্যে গুলি
সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর ধরন প্রায় একই। প্রথমে বিদেশ (মূলত দুবাই) থেকে বড় সাজ্জাদের ফোন বা বার্তার মাধ্যমে টার্গেটকে হুমকি দেওয়া হয়। পরে সুযোগ বুঝে রায়হান-ইমনের মতো মাঠ পর্যায়ের সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যা নিশ্চিত করে। এই চক্রগুলো বর্তমানে বিভিন্ন হাট-বাজার, বালুমহাল এবং জমি দখলের মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা:
সরোয়ার বাবলা হত্যাকাণ্ডের পর র‌্যাব ও পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। বাবলার বাবার দায়ের করা মামলায় বড় সাজ্জাদ, রায়হান ও ইমনসহ ৭ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। র‌্যাব ইতোমধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হেলাল ও আলাউদ্দিনসহ মোট ৬ জনকে চট্টগ্রাম ও রাউজানের বিভিন্ন ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার করেছে। তবে মূল হোতা বড় সাজ্জাদ বিদেশে এবং রায়হান-ইমনের মতো সন্ত্রাসীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় জনমনে স্বস্তি ফিরছে না।
নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড ও রাজনীতির এই বিষাক্ত জোট সাধারণ মানুষের জন্য বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

কপিরাইট © 2026 cumilla24